আন্তর্জাতিকপাঠকের লেখা

বহুল আকাঙ্ক্ষিত টেস্ট ম্যাচ ও ক্রিকেটের পুনর্জন্ম

0

নাদের চৌধুরীঃ প্রাণঘাতী করোনার প্রাদুর্ভাবে থমকে থাকা পৃথিবী হামাগুড়ি দিয়ে হলেও চলার চেষ্টায় আছে। স্বল্প পরিসরে হলেও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিনোদনের মাধ্যম, পর্যটনের মত দিক গুলো আস্তে আস্তে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশ।

মাঠে ফেরানোর চেষ্টা চলছে বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম আউটডোর স্পোর্টসগুলোকে৷ করোনা আক্রমণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত ইউরোপে ফিরেছে ঘরোয়া ফুটবল। চ্যাম্পিয়নস লিগের মত বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আবার সচল করার সকল অংক কষে ফেলেছেন ইউরোপীয় ফুটবলের হর্তাকর্তারা।

দেরিতে হলেও এবার ক্রিকেটও ফিরছে মাঠে। ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডেই আরেকবার পুনর্জন্ম নিতে প্রস্তুত ক্রিকেট। সাথে সাথে প্রস্তুত কোটি কোটি ক্রিকেটভক্ত চাতক চোখ৷ কোভিড-১৯ এর কারণে দীর্ঘ তিন মাস নির্বাসনে ছিল ক্রিকেট। মার্চ থেকে বাধ্যতামূলক শীতনিদ্রায় চলে যাওয়া ক্রিকেটে একে একে স্থগিত হয়ে গেছে অনেক দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। বাতিলের খাতায় নাম উঠেছে আইপিএলেরও।।

হুমকির মুখে পড়ে গেছে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভবিষ্যতও৷ তবে ক্রিকেটের এই অচল সময়ে নতুন করে আশার মশাল নিয়ে হাজির হয়েছে ইংল্যান্ড-উইন্ডিজের টেস্ট সিরিজ। ৮ জুলাই থেকে ইংল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য গত ২৩ জুন থেকেই দলগত অনুশীলন শুরু করেছে ইংল্যান্ড৷

সিরিজ শুরুর ঠিক একমাস আগেই ইংল্যান্ডে পৌঁছে গেছেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা৷ শেষ করেছেন তাদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকার কাজটাও৷ কাজেই বলাই যায় ৮ জুলাই ক্রিকেটের পুর্নজন্ম দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত সিরিজের প্রথম টেস্টের ভেন্যু সাউদাম্পটন৷ আর সেই টেস্টের মধ্য দিয়ে রাজকীয় ভাবেই মাঠে ফিরবে ক্রিকেট৷

টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে অস্তিত্ব সংকটে থাকা অভিজাত ফরম্যাট টেস্ট ম্যাচ, অভিভাবক হয়েই মাঠে ফেরাচ্ছে ক্রিকেটকে। ধারণা করা হচ্ছে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দর্শক সমর্থন পাওয়া টেস্ট সিরিজ হতে চলেছে ইংল্যান্ড-উইন্ডিজের এই সিরিজ৷ নিরাপত্তার ব্যাপারটা মাথায় রেখে দর্শকরা মাঠে থাকবেন না ঠিকই কিন্তু করোনার আক্রমণে ঘরবন্দী কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্ত বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অবশ্যই চোখ রাখবেন টিভি পর্দায়।

পৃথিবীর সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের নীতিনির্ধারকেরাও খুব সচেতনভাবে চোখে চোখে রাখবেন মাঠ ও মাঠের বাইরের কর্মকান্ডে। কারণ বৈশ্বিকভাবে পুরোদমে ক্রিকেট ফেরানোর জন্য এই টেস্ট সিরিজই হতে চলেছে এসিড টেস্ট। তিন ম্যাচের এই সিরিজের সফলতা আর ভুলভ্রান্তিই ঠিক করে দিবে ভবিষ্যত ক্রিকেটের রূপরেখা।

সেই বিষয়ে মুখ খুলেছেন প্রোটিয়াস গ্রেট শন পোলকও, বলেছেন, ‘আমি মনে করি এই ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট-ইন্ডিজের মধ্যকার সিরিজটি দীর্ঘদিন পর একটি দর্শকপ্রিয় টেস্ট সিরিজ হবে৷ কারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটের জন্য ক্ষুধার্ত এবং নিঃসন্দেহে তারা আবারো টেস্ট ক্রিকেট দেখতে চাইবেন৷ সাথে সাথে আমি এটাও মনে করি যে এই সিরিজ আসলে আমাদের জন্য লিটমাস টেস্ট হতে যাচ্ছে৷ এই সিরিজের পর আমরা বুঝতে পারবো কিভাবে কি করলে কোন ইস্যু ছাড়াই মাঠে ক্রিকেটকে রাখা যাবে৷’

ক্রিকেট পিপাসুদের বাইরের অনেক অনিয়মিত ক্রিকেট ভক্তদের জন্যও এই সিরিজ আসলে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দী থেকে সৃষ্টি হওয়া একঘেয়েমিতে কিছুটা হলেও রোমাঞ্চের যোগান দিবে এই টেস্ট সিরিজ। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর জন্য এই সিরিজ নিয়ে আসতে পারে আলোর বার্তা।

এই বিষয়ে ল্যাংকাশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তা ডেনিয়েন গিডনে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আবার মাঠে ফেরাকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এটা নিঃসন্দেহে ক্রিকেটপ্রেমী দর্শক, ক্রিকেটার, কোচসহ এই খেলার সাথে জড়িত সবার মানসিক শক্তি বাড়াবে।’

অসংখ্য পরিবর্তনের বার্তাবাহক হয়ে মাঠে গড়াচ্ছে এই টেস্ট সিরিজ। বলে লালা ব্যবহারের চিরায়ত অভ্যাসের উপর ফুলস্টপ বসিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি৷ লালা ব্যবহারে থাকছে শাস্তির বিধানও। প্রথমবার এইরকম কোন ঘটনা ঘটালে কপালে জুটবে ওয়ার্নিং। আর দ্বিতীয়বারেই প্রতিপক্ষের রানের খাতায় যোগ হয়ে যাবে অতিরিক্ত ৫ রান। সাথে সাথে আরেকবার বলকে বোলারের হাতে যাওয়ার আগে যেতে হবে পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়ায় মধ্যে দিয়ে!

২০০২ সাল থেকে চলে আসা টেস্টে নিরপেক্ষ আম্পায়ারের নিয়মও শিথিল করা হয়েছে৷ ভ্রমণ ও ভিসা জটিলতা এড়াতে দেশীয় আম্পায়ার দিয়েই ম্যাচ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশের মত টেস্ট খেলুড়ে দেশের আম্পায়াররা এলিট প্যানেলে না থেকেও পেয়ে যাবেন টেস্ট ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ৷ আর স্বাগতিক

আম্পায়ারদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের খড়গ থেকে ম্যাচকে বাঁচাতে প্রত্যেক দল প্রতি ইনিংসে পাবেন বাড়তি একটি সহ মোট তিনটি রিভিউ৷ আর এইসব নতুন নিয়মের খড়গে পরে গতির সাথে সুইং মিশিয়ে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করা বোলাররা কিভাবে নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন সেইটাও থাকবে দর্শকদের অন্যতম কৌতূহলের বিষয়।

ক্রিকেট ফিরছে দর্শকশূণ্য গ্যালারিতে৷ ইংলিশ পেস তারকা স্টুয়ার্ট ব্রড ইতিমধ্যেই বলেছেন, ‘দর্শক ছাড়া খেলাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হবে৷ আন্তর্জাতিক ম্যাচ নামক যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে এখন নিশ্চিতভাবে ক্রিকেটারদের আরো বেশি মানসিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।’

এতো অনিশ্চয়তার চোখ রাঙানির পরেও দিনশেষে নিশ্চিতভাবে স্বস্তিই অনুভব করার কথা ব্রডের৷ রিমোট হাতে টিভির সামনে উৎসুক অপেক্ষায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার কথা কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর৷ কারণ ক্রিকেট যে ফিরছে তার জন্মভূমিতে অভিজাত ফরম্যাটের মধ্য দিয়ে। ক্রিকেট ফিরছে বহুল আলোচিত টেস্ট-সিরিজের জন্ম দিয়ে৷ ক্রিকেট ফিরছে পুনর্জন্মের আনন্দ আর স্বস্তি নিয়ে। ক্রিকেটকে স্বাগত জানাতে আপনি প্রস্তুত তো? আর মাত্র দুইদিন…

জেটি

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *