পাঠকের লেখাফিচারবাংলাদেশ

তারকা জন্মদিন : টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হক

0

সিফাত হাছান সুমাইয়াঃ সৌরভ শব্দের অর্থ সুগন্ধ, সুবাসিত করা। নিজের জীবনকে সুবাসিত করুক, পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পরুক গুণ আর খ্যাতির সুগন্ধ- এমন ইচ্ছা থেকেই হয়তো বাংলাদেশ টেস্ট দলের বর্তমান অধিনায়ক মুমিনুল হকের বাবা-মা তার ডাক নাম রেখেছিলেন সৌরভ। পুরো নাম মুমিনুল হক সৌরভ।

বাংলাদেশে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত, পৃথিবীর বিখ্যাত সমুদ্রসৈকতের জেলা কক্সবাজারেই জন্ম নিয়েছেন মুমিনুল।কিন্তু সাগরপাড়ে বেশিদিন বেড়ে উঠার সুযোগ হয়ে উঠেনি তার। ষষ্ঠ শ্রেণি অবধি পড়ালেখা করেছেন নিজ শহরে, তারপর ভর্তি হন সাভারের জিরানিতে অবস্থিত বিকেএসপির (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ক্রিকেট বিভাগে। সময়টা ছিল ২০০৪ সালের জুলাই মাস।

সাগরপাড়ে জন্ম নিয়ে খুব বেশিদিন সেখানে বেড়ে উঠার সুযোগ না মিললেও, সমুদ্রের সৌন্দর্য্যকে নিজের ব্যাটিংয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। সৌরভের ক্রিকেটীয় গ্রামার মেনে ব্যাট করার মধ্যে যে সৌন্দর্য্য নিহিত, সেই ব্যাটিং ক্রিকেট বিশ্ব খুব কমই দেখেছে। সমুদ্র পাড়ে বেড়ে ওঠা ৫ ফিট সাড়ে ৩ ইঞ্চির মুমিনুল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন ক্লাসিক্যাল ব্যাটসম্যান হিসেবে।

কিন্তু “জীবন মানে পুস্প শয্যা নয়, রয়েছে কাঁটার আঘাত” এই কথাটা সত্যি হয়েছিল এই ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেও। বিকেএসপিতে ভর্তির প্রথমেই উচ্চতার জন্য বাঁধা পেয়েছিলেন, সেবার তাকে নির্বাচিত করা হয়নি কম উচ্চতার কারণে। কিন্তু তিনি হেরে গিয়ে থেমে ছিলেন না, টানা একবছর কাজ করেছেন নিজের উচ্চতা নিয়ে। ফলাফল হিসেবে পরের বছর বিকেএসপিতে ভর্তি হন; প্রমাণ করেন, ভাগ্য পরিশ্রমীদের সঙ্গেই থাকে।

ছোট থেকেই যে তিনি পরিবারের সবার সমর্থন পেয়েছিলেন খেলার ব্যাপারে- এমন কিন্তু না। স্কুল শিক্ষিকা মা হয়তো চেয়েছিলেন তার দ্বিতীয় সন্তান সৌরভ লেখাপড়ায় নিজের নামকে উজ্জ্বল করবে। তাই শুরুর দিকে তিনি ছেলের ক্রিকেট খেলাকে সমর্থন করেননি। দেশের অন্যান্য বাবা-মায়ের মতো তিনিও ছেলেকে ক্রিকেট থেকে দূরে রাখতে ক্রিকেটের ব্যাট পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাই বলে থেমে ছিলেন না মুমিনুল, লুকিয়ে লুকিয়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন খেলা।

অবশ্য লড়াইয়ে সাহায্য করেছিলেন বাবা নাজমুল হক আর বড় ভাই শাওন। মায়ের চোখের আড়ালে একপ্রকার যুদ্ধ করেই তিনি পরিবারের সকলের সমর্থনে বিকেএসপিতে পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য বাঁহাতি ব্যাটসম্যান এবং একইসঙ্গে বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার হিসেবে। টেস্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি তিনি। তিনি আজ তার পরিবারসহ এই দেশের গর্ব।

মুমিনুল হক কক্সবাজারের যেই মাঠে ক্রিকেট খেলতেন সেই মাঠে ক্রিকেটারদের বাছাই করার জন্য বিকেএসপি থেকে কোচ আসত। সেখানে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফরহাদ নামের এক বন্ধু আর তার খেলা পছন্দ হয়ে যায় বিকেএসপির কোচ নাজিম উদ্দিনের। তিনি মুমিনুলকে বলেন তার বাবা-মাকে নিয়ে আসতে। সেদিন অনেক কষ্টে মাকে রাজি করিয়েছিলেন মুমিনুল। সেই বিকেএসপি থেকেই যাত্রা শুরু।

সেখান থেকে ২০১০ সালে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন তিনি, ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম সদস্য। তার আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে মমিনুল হকের। ২০০৮-০৯ মৌসুমে ঢাকা বিভাগীয় ক্রিকেট দলের হয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেট দলের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হয় তার। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যান। সফরের প্রথম ম্যাচে দেড়শতাধিক রান করেন তিনি।

২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে মুমিনুল হকের পথচলা শুরু। সে বছরের ৩০ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক মুমিনুলের, ক্যাপ নম্বর ১০৪। কিন্তু নিজের অভিষেক ম্যাচে ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি মুমিনুলের। পরের বছর ৮ মার্চ শ্রীলঙ্কার গল টেস্টে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল তার; টেস্ট ক্যাপ নম্বর ৬৭। অভিষেক টেস্টেই ৫৫ রানের ইনিংস ও সিরিজে ৫২ গড়ে ১৫৬ রান সংগ্রহ করে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন এই ফরম্যাটে একদিন দেশের হয়ে রাজ করবেন। ঠিক হয়েছেও তাই। এখন অবধি তার যত সাফল্য সব টেস্ট ক্রিকেটেই।

মুমিনুলের টি-২০ অভিষেক ২০১২ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই, ১০ ডিসেম্বর। দেশের ৩৪ নম্বর টি-টোয়েন্টি ক্যাপ পরিহিত ক্রিকেটার প্রথম ম্যাচে ব্যাট হাতে নামার সুযোগ পাননি।

ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনি অনিয়মিত হয়ে পড়েন ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর, ধীরে ধীরে তার নামের পাশে টেস্ট স্পেশালিস্টের তকমা লেগে যায় এবং বাকি দুই ফরম্যাট থেকে দূরে সরে তিনি হয়ে যান পুরোদস্তুর টেস্ট ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশ দল খুব বেশি সংখ্যক টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়ায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুমিনুলের উপস্থিতি কমতে থাকে। তবে তিনি নিয়মিত ছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে।

২০১৫ সালের পরে আবার ওয়ানডে দলে জায়গা পেয়েছিলেন ২০১৮ সালে এবং তার শেষ ওয়ানডে ম্যাচ ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে, আবুধাবিতে। সেই ম্যাচে ৪ বলে ৫ রান সংগ্রহ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত ২৮টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ২৬ ইনিংসে ৫৫৭ রান সংগ্রহ করেছেন মুমিনুল।

টি-টোয়েন্টিতেও খুবই কমসংখ্যক ম্যাচ খেলেছেন তিনি। মাত্র ৬ ম্যাচে ৪ ইনিংসে তার সংগ্রহ ৬০ রান। সবশেষ ম্যাচ খেলেছেন ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল; টি-২০ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মত শেষটাতেও ব্যাট হাতে নামার সুযোগ হয়নি মুমিনুলের।

ক্যারিয়ারে তিনি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল টেস্ট ক্রিকেটে। এই ফরম্যাটে তিনি একটাসময় ব্যাটিং গড়ে ছিলেন অনন্যতায়, তার ওপরে ছিল শুধু স্যার ডন ব্রডম্যানের নাম। এই ফরম্যাটে তার আছে টানা ১১ ম্যাচে ফিফটি করার রেকর্ড। টেস্ট ক্রিকেটে তিনি নিজেকে দেশসেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার নামের পাশে রয়েছে ২৮৬০ রান। এ পর্যন্ত ম্যাচ খেলেছেন ৪০টি।

এই ফরম্যাটে সেঞ্চুরির সংখ্যাতেও এগিয়ে রয়েছেন তিনি। তার শতক সংখ্যা ৯টি এবং অর্ধশতক ১৩টি। টেস্টে মুমিনুলের ব্যাটিং গড় এখন ৪০.৮৫, যা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই ফরম্যাটে মুমিনুলের আছে চার বার ম্যান অব দা ম্যাচ হওয়ার রেকর্ড। মজার বিষয় হচ্ছে, টেস্টে ৩৩১ বার তার ব্যাট থেকে চারের মার আসলেও, ছক্কা হাঁকিয়েছেন মাত্র সাত বার।

টেস্টে তার বড় কষ্টের স্মৃতি হতে পারে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ১০০তম টেস্টে একাদশের বাইরে থাকা। তবে টেস্টে তার জন্য বড় সুখবর হচ্ছে সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশের টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া। যদিও বড় এক অস্থির অবস্থায় তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

নিজেকে ‘টেস্ট বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে পরিচিত করে ফেলা মুমিনুল যখন দলের নেতৃত্ব পেয়েছিলেন, তখন তার সামনে ছিল বড় দুটি উপলক্ষ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলবে, প্রথমবারের মতো খেলবে গোলাপি বলে দিবারাত্রির ম্যাচ। ভারতের মাঠে ভারতের বিপক্ষে ভালো খেলার চ্যালেঞ্জ তো ছিলোই। তাঁকে একই সঙ্গে খেলোয়াড় ও অধিনায়ক সাকিবের শূন্যতা পূরণের চ্যালেঞ্জও নিতে হয়েছে। তিনি সফল ছিলেন এই কথা বলা যায় না। তবে তার অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে অনেক কিছু যোগ হয়েছে বলাই যায়। হয়তো সামনে আরও বেশি সুযোগ পেলে তিনি এই নতুন দায়িত্বেও সফল হতে পারবেন।

২৯ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ টেস্ট দলের নতুন দলপতি মুমিনুল হকের জন্মদিন। এইবারের শ্রীলংকা সফরে হয়তো ভাল কিছু উপহার দেয়ার মধ্য দিয়ে নিজের জন্মদিনকে রাঙাতে পারতেন অধিনায়ক কিন্তু আপাতত এই সফর স্থগিত হয়ে যাওয়ায় জন্য টেস্ট অধিনায়ককে আরও কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *