পাঠকের লেখা

শুভ জন্মদিন ‘কলকাতার রাজপুত্র’

0

মেহেদী মহসিনঃ ২০০০ সাল। ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ভারতীয় ক্রিকেট। ঠিক এমন সময় ভারতের অধিনায়ক হয়ে আসলেন তিনি। এরপরের গল্পটা সবার ই জানা। তবুও আবার বলছি নতুন করে। নতুন মোড়কে সেই পুরনো ক্রিকেট রোমান্টিসিজমের গল্প।

বিদেশের মাটিতে ম্যাচ জেতা, ভারতের জন্য তা এক সময় দূরের আকাশের তারা হয়েই ছিল। খেলতো রক্ষণাত্মক ক্রিকেট। ভারতকে তখন বলা হতো ‘ঘরের মাঠের বাঘ, বিদেশে বিড়াল’।

সেই দলটাকেই খোলনলচে বদলে ফেললেন তিনি। শেখালেন কীভাবে বিদেশের মাটিতে জিততে হয়, শেখালেন কীভাবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হয়। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন আমি কার কথা বলছি। আমি বলছি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দেয়া অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির কথা।

বীরেন্দ্র শেবাগ,হরভজন সিং, যুবরাজ সিং, জহির খানদের নিয়েই বিশ্বকাপ জিতেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু এরা একেকজন পরিণত হয়েছিলেন, সৌরভের আমলেই, সৌরভের নেতৃত্বে খেলেই। ধোনিকে ভারতের সফলতম অধিনায়ক বলা হয়। সেই ধোনির উঠে আসার পেছনেও অবদান সৌরভেরই।

২০০০ সালের মিনি বিশ্বকাপের (বর্তমান আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) ফাইনালে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেও দলকে জেতাতে পারেননি। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল গুলোতেও হারছিল ভারত।

কিন্তু ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের ফাইনালে ৩২৫ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে মো কাইফ আর যুবরাজ সিং এর দৃঢ়তায় জিতে যায় ভার‍ত। আর সেদিন লর্ডসের ড্রেসিংরুমের বারন্দায় দাঁড়িয়ে জার্সি খুলে উদযাপন করেছিলেন সৌরভ। এই দৃশ্যটা ভারতীয় ক্রিকেট তথা গোটা ক্রিকেট বিশ্বের আইকনিক এক মুহূর্ত হয়ে আছে।

২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালটাও হয়তো জিততে পারতো ভারত। কিন্তু বৃস্টির কারণে খেলা পরিত্যক্ত হলে ভারত আর শ্রীলংকা যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন করে দেয়া হয়।

২০০৩ সালের বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে আবার সেই স্বপ্নভঙ্গ। ২০০৪ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের সাথে টেস্ট সিরিজ ড্র করে ভারত। এর কিছুদিন পর প্রথম ভারতীয়  অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানের মাটিতে ওয়ানডে আর টেস্ট সিরিজ জেতান দলকে। ২০০৪ এর এশিয়া কাপ ফাইনালে আবারও ফাইনালে উঠে স্বপ্নভঙ্গ হয় ভারতের।

প্লেয়ার্স ক্যাপ্টেন ছিলেন সৌরভ। বিপদে ঢাল হয়েছেন, ব্যাট ধরেছেন তাদের হয়ে। চাপড়ে দিয়েছেন তাদের পিঠ।

বীরেন্দ্র শেবাগ প্রথমে ছয় নম্বর পজিশনে ব্যাট করতেন, কিন্তু সৌরভ তাকে তুলে আনেন ওপেনিংয়ে। সেই টোটকাটা দারুণভাবে কাজে লেগে গেল। শেবাগ ক্রমেই হয়ে ওঠেন ভয়ংকর। ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনার তিনি।

২০০১ সালে কলকাতা টেস্টে অজিদের বিরুদ্ধে ফলো অনে পড়ে ভারত। প্রথম ইনিংসে শুধু মাত্র ভিভিএস লক্ষ্মণ ফিফটি করেছিলেন। তাকেই অজি বোলারদের বিরুদ্ধে সাবলীল মনে হয়েছিল। তা দেখে দ্বিতীয় ইনিংসে লক্ষণকে তিন নম্বর পজিশনে ব্যাট করতে পাঠান সৌরভ। নিয়মিত ব্যাট করতেন ছয় নম্বর পজিশনে।ওদিকে অদলবদল হয়ে রাহুল দ্রাবিড়ের সাথে। লক্ষ্মণ দ্রাবিড় মিলে সৃস্টি করেন ইতিহাস। ভারত সে ম্যাচ টি জিতে যায়। আর লক্ষ্মণ খেলেন ২৮১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস।

২০০৩ সালের বিশ্বকাপে প্রথমে অনিল কুম্বলেকে স্কোয়াডে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বোর্ড। কিন্তু সৌরভ বললেন, কুম্বলকে তার চাই। সৌরভের জেদেই সেদিন কুম্বলে দলে ঢুকেছিলেন আর পুরো টুর্নামেন্টেই ভাল করেছিলেন। ভারতও সেবার ফাইনালে গিয়েছিলো।

যে মানুষটি ভারতীয় ক্রিকেটকে এতকিছু দিয়েছিলেন তাকেই দেখতে হয়েছিলো মুদ্রার উল্টো পিঠ। অধিনায়ক হওয়ার পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ভারতের কোচ ছিলেন জন রাইট। সৌরভ- রাইট জুটিতেই একের পর এক সাফল্য আসছিলো। কিন্তু ২০০৪-০৫ সালের দিকে দলের পারফরমেন্স খারাপ হতে শুরু করলে সৌরভ- রাইট জুটির যাত্রা শেষ হয়ে যায়।

কোচ হয়ে আসেন গ্রেগ চ্যাপেল। চ্যাপেলের সাথে বিতণ্ডা শুরু হলো সৌরভের। তিনি ছিলেনও অফফর্মে। অধিনায়কত্ব খুইয়ে বসেন, বাদ পড়েন দল থেকেও।

২০০৭ সালে তিনি ফিরলেন আবার। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাধ্যমে টেস্ট দলে জায়গা পেয়েই দুর্দান্ত পারফর্ম করলেন। ফেরার পর প্রথম ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে করলেন সেঞ্চুরি। বছরের শেষে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি, হয়েছিলেন সিরিজ সেরা। সেই সিরিজেই শেষ ওয়ানডে খেলেন। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে শেষ টেস্ট খেলে বিদায় জানান ক্রিকেটকে।

খেলা থেকে অবসর নিলেও ধারাভাষ্যকার হিসেবে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি বিসিসিআই সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত আছেন। নিজের ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ই তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনোই হার মানেননি। সকল যুদ্ধ জয় করেই এগিয়ে গেছেন। সবার কাছে তিনি ‘প্রিন্স অব কলকাতা’ নামেও পরিচিত।

সৌরভই আমার ক্রিকেটের প্রথম ভালোবাসা। উনাকে দেখেই ক্রিকেটকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। বাম হাতে ব্যাটিং করায় নিজেকেও তার মত ভাবতাম আর পাড়ার ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করার সময় উনার মত হতে চাইতাম। রিকি পন্টিং, মহেন্দ্র সিং ধোনি হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে দাদাই ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক।

আজ সৌরভের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন সৌরভ গাঙ্গুলি। শুভ জন্মদিন ‘কলকাতার রাজপুত্র’

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *