আন্তর্জাতিকপাঠকের লেখাফিচার

‘দ্য কিং অ্যান্ড আই’ (পর্ব-২)

0

মাহমুদুল হাসান বাপ্পীঃ সাল ১৯৯৩, সোয়ানসি, ইংল্যান্ড। এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতরণ হলো সেখানে, অন্তত ক্রিকেটের জন্য। গ্ল্যামারগানের বিপক্ষে কাউন্টি ম্যাচে মুখোমুখি হ্যাম্পশায়ার। খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। মনে রাখার মতো কিছু নয়। তবে যখন শুনবেন, এই ম্যাচেই ম্যালকম মার্শালের মুখোমুখি হয়েছিলেন ক্রিকেটের ‘রাজা’ ভিভ রিচার্ডস। তখন মনে রাখা উচিত কি না, সে ভার আপনার ওপর।

সে সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত দুই বোলার ও ব্যাটসম্যান মুখোমুখি হয়েছেন একে অপরের বিপক্ষে। লড়াইটা জিতলেন কে? ম্যালকম দৌড়ে এসে বলটা করলেন। ভিভের ব্যাটে লেগে বলটা যেন ছুটল অগ্নিমূর্তি ধারণ করে, পুরো স্টেডিয়ামে নেমে এলো নীরবতা, শেষ রাতের অন্ধকারের যেমন নিস্তব্ধতা, তেমন।

ইংল্যান্ডকে এক টেস্টে নেতৃত্ব দেয়া ক্রিস কাউড্রে সেসময় ছিলেন সেখানে। ঘটনাটি তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘পুরো জায়গাটাই নীরব হয়ে গেল। আমরা দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। তারপর তাকিয়ে থাকলাম ভিভের দিকে। একটা শব্দ মুখ ফুটে বলার সাহসও তখন ছিল না কারো।’

ভিভ এরপর এগিয়ে এলেন সিগারেট হাতে কোনো যোদ্ধার মতো। তারপর চিৎকার শুরু করলেন এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকলেন। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিলো, ভিভ কি আম্পায়ার কিংবা মার্শালের দিকেই তেড়ে আসছিলেন নাকি। সৌভাগ্যক্রমে সেটা হয়নি। তাদের পেরিয়েও ভিভ দ্রুত হাঁটতে থাকলেন। তারপর সন্ত্রাসীর মতো করে তাকালেন দর্শকদের দিকে।

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

সাইটস্ক্রিনের পাশে থাকা একজনকে ডেকে বললেন, ‘এই যে, তুমি!’, অগ্নিদৃষ্টিতে আঙুল তুলে দেখালেন একজনকে। যিনি খুব মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে ছিলেন খবরের কাগজে। পাশের কয়েকজনের ‘তুমি’ বলাতে যার হুশ ফিরে আসে। হকচকিত হয়ে ‘কে! আমি?’ বলা শেষ করতেই হুঙ্কারের সুরে পাশের লোকজন বুঝিয়ে দেন, ‘হ্যাঁ, তুমিই’।

এরপর ভিভ বলছেন, যেন বুঝাচ্ছেন কতটা বোকা ওই দর্শক, ‘ডেভিড গাওয়ার ও রবিন স্মিথ স্লিপে দাঁড়িয়ে আছে। বোলিংয়ে ম্যালকম মার্শাল, যে কি না পৃথিবীর সেরা ফাস্ট বোলার। বল করছে ভিভ রিচার্ডসকে। আর তুমি (গালি দিয়ে) পড়ছ পত্রিকা?!’ হতভম্ব দর্শক কি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন পরে? না বোঝার কোনো কারণ তো অবশিষ্ট নেই।

স্যার লেন হাটন ভিভকে নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ শুনিয়েছিলেন, ‘ভিভ নেমে আসে ক্রীতদাসের মতো। আর উইকেটে থাকে এমনভাবে যেন এটা কোনো বাগান এবং এটার মালিক কেবলই সে।’

তার এই মন্তব্যটা পুরোপুরি সত্য। ভিভ এমনভাবে আসেন, যেন তিনি কোনো রোমান সম্রাট, যাচ্ছেন ধর্মযুদ্ধে। উইকেটে আসার পরই খতম করতে চান সবাইকে এবং সাধারণত ভিভ সফলই হন।

১৯৮০ সালের দিকে, হ্যাম্পশায়ারে স্টিভ মালোনি নামে একজন ফাস্ট বোলার ছিল। যাকে ডাকা হতো পিগি নামে। সে নিজেকে যত দ্রুতগতির বোলার ভাবত, আসলে ততটা ছিল না। ‘৮১ তে সে মুখোমুখি হলো ভিভ রিচার্ডসের। তিনি তখন সামারসেটের হয়ে খেলেন। প্রথম বলে পিগি পরাস্ত করল ভিভকে, দ্বিতীয় বলেও ঘটল একই ঘটনা। এরপরই সে বড় একটা ভুল করে ফেলল, অনেক বড় ভুল! ভিভকে উদ্দেশ্য করে ভেংচি। পরে যা হওয়ার, হলো তাই।

তৃতীয় বলটাই হলো বর্বরতার শিকার। ভিভ এটাকে এমনভাবে মারলেন, মনে হলো বলটা আর কখনো স্টেডিয়ামে ফিরে আসবে না। ঐ ম্যাচে ৯৫ রান করেছিলেন ভিভ, দারুণ এক পার্টনারশিপ ছিল ইয়ান বোথামের সঙ্গে, যিনি হাঁকিয়েছিলেন সেঞ্চুরি। ৪০ ওভারের ম্যাচে হ্যাম্পশায়ার হেরেছিল ১৪৯ রানে। কাউড্রে বলছেন, ‘দুর্ভাগ্যক্রমে আমি এই ম্যাচটাতে ছিলাম ভুল প্রান্তে।’

তবে এই ম্যাচের আলোচনার মূল কারণ ভিভের রুদ্রমূর্তি না। ম্যাচ শেষেই হ্যাম্পশায়ারের ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন ভিভ, অবশ্যই পিগিকে খুঁজতে। তাকে পেয়ে একটা চওড়া হাসি দিয়ে হ্যান্ডশেক করেন ভিভ। এরপরই চলে আসেন আসল কথায়, ‘তোমার সহ-খেলোয়াড়কে সম্মান করা উচিত। আমরা সবাই কি ভালো?’

পিগি একটুও নড়ে গেল, হাসল খুব নার্ভাসনেসকে সঙ্গী করে। কাউড্রে এসব স্মৃতিচারণের সঙ্গে এও বলছেন, ‘এটা না বললে পিগির প্রতি অবিচার করা হবে। দুই বছর পর বেনসন এন্ড হেজেস কাপে ভিভকে ১৬ রানে আউট করেছিল সে এবং একটি শব্দও তখন উচ্চারণ করেনি।’

কাউড্রে বলছেন, ‘একবার, গার্ডিগেন কনর নামে এক বোলার প্রথম বলেই ভিভের স্টাম্পটা উপড়ে ফেলল। আমরা উদযাপন শুরু করলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধল অন্য জায়গায়, আম্পায়ার নো কল করলেন। এরপর ভিভ এমনভাবে খেলা শুরু করলেন, হারে হারে বুঝিয়ে দিলেন সেই সেলিব্রেশনটা কত বড় ভুল ছিল। কনর বেশ ভালো বোলার ছিল। তবে ভিভ তাকে সে ম্যাচে তুচ্ছই করে ছেড়েছিলেন।’

যেমনটি তিনি করেছেন পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে, দর্শক, সতীর্থ এমনকি প্রতিপক্ষকেও মুগ্ধ করেছেন অবিরত। নিজের ব্যাটের জাদুতে বের করে নিয়েছেন ম্যাচ। তাই তো এত বছর পরও, ভিভ ক্রিকেটের এক ক্যারিশমাটিক চরিত্র হিসেবে সমান উজ্জ্বল।

(ক্রিকইনফোতে  সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ক্রিস কাউড্রের বর্ণনায় গত এপ্রিলে ‘কিং অ্যান্ড আই’ শিরোনামে লিখেছিলেন মার্ক নিকোলাস। সেই লেখা থেকে ভাবানুবাদকৃত)

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *