আন্তর্জাতিকপাঠকের লেখাফিচার

‘দ্য কিং অ্যান্ড আই’ (পর্ব-১)

1

মাহমুদুল হাসান বাপ্পীঃ ভিভ রিচার্ডসের আত্মজীবনী পুরোটা পড়লেন অথবা পড়লেন না, ব্যাক কাভারটা হয়তো দেখলেন বইটা হাতে নিয়ে কিংবা পুরোটা পড়ে শেষ করে। ইয়ান বোথামের একটা উক্তি আপনার চোখে পড়ার কথা তখন, অবশ্যই সেটা ভিভকে নিয়ে। ক্রিকেট রাজ্যের ‘রাজা’কে নিয়ে, ইংল্যান্ডকে একটি টেস্টে নেতৃত্ব দেয়া ক্রিস কাউড্রে অন্তত মনে করেন তেমনটাই।

তার দেশেরই ইয়ান বোথাম যেমন ভিভকে নিয়ে বলেছেন, ‘ভিভের চেয়ে ভালো খেলোয়াড় আর কেউ ছিল? হয়তো, হয়তো না। তবে আমরা এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ভিভ যখন নিজের ছন্দে থাকে, তখন তার ধারেকাছেও কেউ থাকে না।’

টেস্টে একবারই ইংল্যান্ডের হয়ে টস করতে নেমেছিলেন কাউড্রে, সেটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে; দলটার অধিনায়ক তখন ‘রাজা’ ভিভ রিচার্ডস। নিজেকে সৌভাগ্যবানদের একজন ভাবতে কাউড্রের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু জরুরি না। নিজের সে গল্প তিনি শুনিয়েছেন এমনভাবে, যেন কোনো নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে থিয়েটারে।

১৯৮৮ সালের জুলাই মাসের এক সকাল। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা ২১ জুলাই। প্রথমবার সাদা পোশাকে টস করবেন, সেটা কাউড্রেকে তখন এক নজর দেখলেই বুঝে ফেলার অবস্থা। ট্র্যাকসুট গায়ে চাপিয়ে ট্রাউজারটা পরে তিনি হেডিংলিতে যাচ্ছেন টস করতে। একটু একটু ‘ভাব’ তখনো আছে তার শরীরে।

তবে একটু পরই সেটা উধাও হলো। প্রতিপক্ষ অধিনায়ক আসছেন নিজের পুরো ভাবগম্ভীর্য রক্ষা করে, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, পৃথিবীর প্রতি ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাবটা নিয়ে। ভিভ রিচার্ডস তিনি। এই পৃথিবীতে ক্রিকেট খেলে, এমন মানুষদের মধ্যে কাউড্রের সবচেয়ে প্রিয়। তার সঙ্গেই হাতবদল হলো টিম লিস্ট।

কাউড্রে বলতে শুরু করলেন এক নাগাড়ে, অনর্গলভাবে, ‘আচ্ছা। আমাদের দলে খেলবে গুচ, কোরটিস, এথেই, গাওয়ার, লাম্ব, স্মিথের অভিষেক হচ্ছে…’ হঠাৎই থামতে হলো তাকে, থামিয়ে দিলেন ভিভ নিজেই, ‘কোনো সমস্যা নেই কাউ, তুমি যাকে ইচ্ছে খেলাতে পারো’ বলে।

সে ঘটনার বর্ণনা করে কাউড্রে এত বছর পরও বলছেন, ‘আমার মনে হয় ভিভ তখনো খুব বেশি আগ্রহী হতো না, যদি আমি এটা বলতাম যে, হটন কিংবা কম্পটন আমাদের দলে খেলবে। সে সত্যিই প্রতিপক্ষ কে, তা নিয়ে চিন্তাই করে না। আমি বলা শেষ করলাম। তারপর সে শুরু করলো।’

সে অর্থাৎ ভিভ নিজের দলের সদস্যের নাম পড়তে শুরু করলেন, ‘ওকে, এখন,আমাকে চিন্তা করতে দাও…ভুলে গেলাম। গ্রিনিজ, না গর্ডনের ইনজুরি। সুতরাং ডেসিই, তারপর ডুজ, হ্যাঁ, ডুজ…। ওহ আচ্ছা, হেইন্স, ডুজন…রিচার্ডস…রিচার্ডসন…’

কাউড্রে সে সময়ের ঘটনার বর্ণনায় বলছেন, ‘আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে, এতেই হবে। আমি আসলে ধীরে ধীরে জমতে থাকা বরফটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম। তারপর ভিভ আমার দিকে তাকালো, মুখে একটা মুচকি হাসি রেখে বললো আমি কিন্তু সুন্দরভাবে শেষ করতে পারতাম। তখন কোনো ম্যাচ রেফারি অথবা টিম শিটও ছিল না। ভিভ রিচি রিচার্ডসনের নাম নিলেও সে আসলে খেলছিল না। ওটা ছিল কেইথ আথারটন। কিন্তু তবুও আমার কাছে একেকটা নাম মনে হচ্ছিলো বিস্ফোরকের মতো, মনে হচ্ছিলো লিস্টটা পাঠানো হয়েছিল স্বয়ং ঈশ্বর থেকে। সত্যটা বলা উচিত, যেকোনো দলকেই তখন তাদের রীতিমতো উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা ছিল।’

অবশেষে এলো কাউড্রের সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। টসের মুদ্রটা আকাশে ছুঁড়লেন, ভিভ কল করলেন এবং সেটাই সঠিক হলো। ভাগ্যের খেলায় জিতে গেলেন ভিভ রিচার্ডস। সেদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন, বাতাসেও ছিল আদ্রতা। কোনো চিন্তা ছাড়াই বোলিং নেয়ার কথা যে কারো। এটার জন্য দুবার ভাবার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

কিন্তু ভিভ কী করলেন? কাউড্রে বলেছেন সেটা, ‘ভিভ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লো। তারপর বললো, তুমি কী করতে, কাউ? যদিও সে মুখ ফুটে কিছু বললো না। তবুও, তার আচরণে বুঝা গেল ফলাফলে আসলে টস কোনো বড় প্রভাব রাখবে না এমন বিশ্বাসই তার। আমি তখন অধিনায়ক হিসেবে একেবারে নতুন, নার্ভাসও। সিরিজের প্রথম তিন টেস্টেই হেরে নাজেহাল অবস্থা দলের। ভিভ গিয়ে দুজন বোলারের সঙ্গে কথা বললো। একজন ম্যালকম মার্শাল, অন্যজন সম্ভবত কার্টলি অ্যামব্রোস। এসে আমাকে জানালো তারা বল করবে। তারপর আমার ওপর দাদাগিরি দেখিয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরত গেল।’

‘আমি এসব কখনোই ভুলবো না। এই গল্পটা রাতে খাবারের সময় প্যারোডি মতো বলেছিলাম। এটা বুঝাতে, প্রতিপক্ষকে বিমুগ্ধ করার কতটা ক্ষমতা আছে ভিভের। সত্যিই দারুণ। কী অসাধারণ মানুষ সে।’

কাউড্রের সঙ্গে একমত না হওয়ার কারণ নেই সম্ভবত কারো। কী দারুণ মুগ্ধ করার ক্ষমতাই না আছে ভিভের! ব্যাটিংয়ে যেমন করে রাখতেন মোহাচ্ছন্ন, বাইরেও ভিভ ছিলেন তেমনই। আরেকবার জানা হলো কাউড্রের কল্যাণে।

(ক্রিকইনফোতে  সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ক্রিস কাউড্রের বর্ণনায় গত এপ্রিলে ‘কিং অ্যান্ড আই’ শিরোনামে লিখেছিলেন মার্ক নিকোলাস। সেই লেখা থেকে ভাবানুবাদকৃত)

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *